
মধ্য ভারতে ডাইনী শিকার বেশ সাধারণ ব্যাপার।
এবং উপজাতি অধ্যুষিত ছত্তিসগড়ে এটা প্রায়ই ঘটে।
ডাইনী বলে অভিযুক্ত মহিলাদের প্রায়ই অসুস্থতা, মৃত্যু এমনকি ফসলের মন্দার জন্যে দায়ী করা হয়।
ডাইনী সন্দেহে প্রতি বছর কয়েক ডজন মহিলাকে মেরে ফেলা হয়।
রাজ্যটি ২০০৫ সালে জাদুবিদ্যা নিবারণ আইন করলেও শিকার অব্যাহত রয়েছে।
গায়ত্রী পরমেশ্বরন ছত্তিসগড়ে গিয়েছিলেন সেই মানুষগুলির সাথে দেখা করতে যারা এই ভ্রান্ত বিশ্বাস দূর করতে ও নিগৃহীত মহিলাদের বাঁচাতে কাজ করছেন।
এখন রবিবারের দুপুর কিন্তু রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়টির লেকচার হল ছাত্রছাত্রীতে পরিপূর্ণ, বেশিরভাগই আশেপাশের উপজাতীয় এলাকা থেকে আসা।
মঞ্চে ড. দীনেশ মিশ্র একটি পরীক্ষা করছেন।
তিনি একজন ডাক্তার যিনি একটি এনজিও চালান যারা ডাইনী সন্দেহে মহিলাদের নিগ্রহ করার বিরুদ্ধে কাজ করেন।
তিনি একটি সাদা কাগজের উপর একখণ্ড লেবু চিপলেন। রসে কাগজের উপর রক্তের মতো দেখতে লাল রং হল।
জিনিসটা শিক্ষার্থীদের কাছে বেশ পরিচিত কারণ গ্রামের ওঝারা জাদুবিদ্যা হিসাবে এটা প্রায়ই দেখায়। এটা এখনও ভারতের গ্রামীণ সংস্কৃতির একটা অংশ।
তিনি ব্যাখ্যা করলেন এটা একটা রাসায়নিক বিক্রিয়া, কোন কালো জাদু নয়।
শত শত মহিলাকে ডাইনী অপবাদ দেওয়ার ঘটনা দেখার পর ড. মিশ্র বলেন এই ঘটনার মূলে আছে সুশিক্ষার অভাব।
“ছত্তিসগড়ে আমার দেখা সব ডাইনী সন্দেহের ঘটনার ৯৯.৯% হচ্ছে অসুস্থতা ও রোগের কারণে। ডাইনী ধারণাটার মূলে আছে অন্ধ বিশ্বাস, অশিক্ষা ও সচেতনতার অভাব। মানুষ রোগব্যাধি সম্পর্কে জানেনা। তারা ভাবে কেউ কালো জাদু করলেই কেবল অন্য কেউ অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। আমরা এসব মানুষের সাথে কথা বলি এবং তাদের বোঝাই যে সব রোগ ও অস্বাভাবিকতার পেছনে বিজ্ঞানসম্মত কারণ থাকে। আমরা তাদের বলি কেউ কালো জাদু করার কারণে কেউ অসুস্থ হয়না। মানুষ অসুস্থ হয় ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক বা ভাইরাসের কারণে। আমরা তাদের অণুবীক্ষণ যন্ত্রে এগুলো দেখতে বলি। আমরা তাদের বাচ্চাদের পাঠ্যবইগুলো তাদেরও পড়তে বলি।”
একটি বেসরকারি হাসপাতালে ড. মিশ্র প্রতিদিনই রোগী দেখেন। তাদের কেউ কেউ গ্রামের হাতুড়ে ডাক্তারদের শিকার।
“আমি একজন রোগী পেয়েছিলাম যিনি প্যারাপ্লেজিয়ার কারণে হাঁটতে পারতেন না। তার চারপাশের গ্রামবাসীরা মনে করলো কেউ তার উপর কালো জাদু করেছে। তিনি স্থানীয় ওঝার কাছে গেলেন যিনি তাকে বললেন যে তাকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাবেন। রোগী যেহেতু হাসপাতালে আসতে পারবেন না কাজেই আমি আমার এক বন্ধুর সাথে গ্রামটিতে গেলাম। গ্রামবাসীরা আমাকে বললেন তারা তার চিকিৎসা করছেন। কিন্তু আমি দেখলাম গ্রামের ওঝা শুধু তাকে নিয়ে অর্থহীন আচার অনুষ্ঠান করছেন। তারা গরুর গাড়িতে করে রোগীকে ওঝার কাছে নিয়ে যাবে এবং তাকে ২০০ থেকে ৪০০ মার্কিন ডলার দেবে। এই টাকা দিতে তারা গয়নাগাটি বেচে দেবে বা ঋণ করবে। তারা খুবই গরীব, প্রান্তিক মানুষ।”
এবং যখন রোগী ভালো হয়না তখন ওঝা ওই সমাজের কাউকে এই অসুস্থতার জন্যে দায়ী করে, সাধারণত কোন মহিলাকে।
অন্য গ্রামবাসীরা তখন ওই অভিযুক্ত মহিলাকে অত্যাচার করে।
স্থানীয় সংবাদপত্র অনুসারে ভারতে প্রতি বছর দুইশরও বেশি ডাইনী শিকারের ঘটনা ঘটে।
এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে ছত্তিসগড়, সাথে মধ্য ও পূর্ব ভারতের কিছু রাজ্য।
২০০৫ সালে রাজ্যটি জাদুবিদ্যা প্রতিরোধ আইন করে যাতে কোন মহিলাকে ডাইনী সাব্যস্ত করলে তিন বছরের সাজার ব্যবস্থা রয়েছে।
রাজ্যটির রাজধানী থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরের ছোট্ট গ্রাম লাছকেরার তিনজন মহিলা এই আইনের সাহায্যে তাদের অধিকারের জন্যে লড়াই করেছেন।
১২ বছর আগে গ্রামের একটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্যে গ্রামবাসী তাদেরকে ডাইনী অভিযুক্ত করে।
তীরাথ বাঈ আমাকে বললেন ঐদিন কি ঘটেছিল।
(কাঁদতে কাঁদতে) “তারা আমাদের সব কাপড় খুলে নিয়ে পুড়িয়ে দেয়। এবং আমরা পুরো গ্রামের সামনে নগ্ন হয়ে বসে ছিলাম। তারা আমাদের মাথা মুড়িয়ে দেয়। আমরা তিনজনই ছিলাম মহিলা। আমরা কাঁদছিলাম। ঈশ্বরের নামে আমাদের বাঁচানোর মতো কেউ ছিল না। আমার বন্ধু বিসাহিন বাঈয়ের মাসিক চলছিল এবং রক্ত পড়ছিল। সবাই সামনে বসে তাকিয়ে তাকিয়ে হাসছিল এবং হাততালি দিচ্ছিল। ওহ ঈশ্বর! তারপর তারা আমাদের বলল আগুনে ঝাঁপ দিতে। “এস এস লাফিয়ে পড়।” আমরা প্রত্যাখ্যান করলে তারা গ্রামে ঘোষণা করে দিলোঃ “সবাই দরজা বন্ধ করে দাও এবং মহিলারা ভেতরে থাকো। এই ডাইনীরা গ্রামে ন্যাংটো হয়ে ঘুরে বেড়াবে।” তারা আমাদের নগ্ন করে সারা গ্রাম ঘুরিয়েছে। ওহ ঈশ্বর!”
আট ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তাদের অপমান করা হয় এবং নির্দয়ভাবে পেটানো হয়। কপালের জোরে তারা বেঁচে গেছেন।
অনেক ক্ষেত্রেই ডাইনী অপবাদ মারাত্মক হয়। সরকারি হিসাবমতে প্রতি বছর এক ডজন মহিলাকে মেরে ফেলা হয়।
নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা একটি স্থানীয় এনজিওর সাহায্যে তীরাথ বাঈ ২০০৬ সালে তার মামলাটি আদালতে তোলেন।
শশী সাইল নারী দলটির প্রধান যারা বিচারে সাহায্য করেছিলেন।
“এটা একটা ভালো আইন। মহিলাদের জন্যে উপকারী। এটা সমাজের একটা উপকার করেছে যে এখন একটা ভয় আছে আইনটি ব্যবহার করা হতেও পারে। যেসব মহিলা ডাইনী অপবাদের শিকার হন, আমরা দেখেছি তাদের আচরণে কিছু পরিবর্তন এসেছে। তারা আর নিজেদের অসহায় মনে করেন না বা কোন নারী সংগঠন বা কোথাও থেকে সামান্য সাহায্য, নৈতিক সমর্থন এবং উৎসাহ পেলে তারা বিচারের জন্যে আদালতের দ্বারস্থ হন।”
নিঃসন্দেহে প্রথম মহিলা হিসাবে তারা প্রথম এ ধরণের মামলায় বৈধ জয় পেয়েছেন।
কিন্তু তাদের নির্যাতন করা সেই ১৭ জনের মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড হয়েছে।
তাদের ২০০০ মার্কিন ডলারের বেশি ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছিলো কিন্তু তারা শুধুমাত্র চিকিৎসার খরচ পেয়েছেন।
সংস্থাটির মতে আইন সম্পর্কে অধিক সচেতনতা ভালো ফল আনতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই লেকচার হলে ড. দীনেশ মিশ্র কালো জাদুর উপর মানুষের অন্ধ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে তাদের শিক্ষিত করার উপর কথা বলে যাচ্ছেন।
“এখন হচ্ছে কি আমরা অনেক শিক্ষিত, তরুণ স্থানীয় নেতা পাচ্ছি যারা বোঝেন আমরা কি করতে চেষ্টা করছি। কিন্তু গ্রামীণ পরিবেশে বয়স্ক মানুষেরা বড় বড় সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে থাকেন। মানুষ একজন বয়স্ক লোকের কথা শ্রদ্ধা করে এবং মেনে চলে। কিছু শ্রেণীবিভাগ আছে যা ভাঙ্গা সম্ভব না। তিনি যদি কাউকে ডাইনী সাব্যস্ত করেন তবে কম বয়েসি কেউ তা তার যতোই যোগ্যতা থেকে থাকুক না কেন, সেটার প্রতিবাদ করতে পারবে না।”
তিনি স্বীকার করেন গন্তব্য এখনও সুদূরপরাহত।










