
ভারতে প্রতি বছর হাজার হাজার বাচ্চা নিখোঁজ হয়।
অপরাধ পরিসংখ্যান মতে ভারতে প্রতি ঘণ্টায় ১৩ টি বাচ্চা নিখোঁজ হয়।
অনেকেই শেষ পর্যন্ত দাস হয় অথবা কষ্টকর কাজের জন্যে বা যৌনকর্মী হিসাবে পাচার হয়ে যায়।
রেডিও অস্ট্রেলিয়ার মুরালি কৃষ্ণানের প্রতিবেদন।
দক্ষিণ দিল্লীর বদরপুর এলাকার একটি ঘিঞ্জি গলিতে স্বনির্ভর দলের মহিলারা স্বতঃস্ফূর্ত আলোচনায় বসেছেন। আলোচনার বিষয় দুই বছরের কেবল হাঁটতে শেখা বাচ্চা ফালাকের দুর্দশা যে কিনা আঘাতপ্রাপ্ত মাথা, ভেঙ্গে ফেলা হাত আর গরম ইস্ত্রিতে পুড়িয়ে দেওয়া মুখ নিয়ে দিল্লীর প্রিমিয়ার হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে লড়ছে।
এটা এখনও জানা যায়নি যে এই বাচ্চাটার মা কে বা কে তাকে কেন এভাবে নির্যাতন করেছে।
কিন্তু যেটা পরিষ্কার তা হল দিল্লী থেকে নিয়মিত যেসব বাচ্চা হারিয়ে যায় সেইসব হাজার হাজার বাচ্চার দুর্ভাগ্য।
ঘিঞ্জি গলিটার এই অপরিচ্ছন্ন ঘরের এক কোণে বসা শাইজাদি যিনি নিজেও একজন মা, পাঁচ বছর আগে দিল্লী থেকে তার বোনঝির নিখোঁজ হওয়ার বর্ণনা দিলেন।
“আমার এখনও মনে আছে সেদিন বিকালে আমার বোনঝি তার মামার বাড়ি থেকে এক উৎসবের উপহার আনতে গিয়েছিল। কিন্তু সে আর বাড়ি ফিরে আসেনি। আমরা তাকে খোঁজার জন্যে অনেক টাকা ও সময় নষ্ট করেছি। পুলিশও তাকে খুঁজে বের করতে পারেনি।”
শাইজাদির মতো এরকম অসংখ্য ঘটনা আছে যাতে বোঝা যায় পিতৃশাসিত ভারতে নারী শিশুরা কেমন অবহেলা, বঞ্চনা ও সামাজিক বৈষম্যের শিকার হয় যে এখানে কন্যা শিশু মৃত্যুর হার অন্যতম সর্বোচ্চ।
গত বছরের শুমারির তথ্যে দেখা যায় ১০০০ ছেলে শিশুর বিপরীতে ৯১৪ মেয়েশিশুর জন্ম হয় যাতে বোঝা যায় কন্যা শিশুর ভ্রূণ হত্যা করা হয় যারা জন্মাতে পারেনা।
সেন্টার ফর অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড রিসার্চের প্রমোদ কুমার চৌহান এই এলাকার মহিলাদের মেয়েদের শ্রদ্ধা করতে শেখান। তার প্রতিষ্ঠান লিঙ্গবৈষম্যের বিরুদ্ধে কাজ করছে।
“হ্যাঁ। দিল্লীতে বাচ্চা পাচার হয়। বিশেষ করে মেয়ে শিশুদের যাদের বেশ্যাবৃত্তি বা ঘরের কাজে সাহায্য করার জন্যে পাচার করা হয়। কিন্তু মোটের উপর এটা শিশু নির্যাতন বা যৌন পাচার।”
অসম লিঙ্গ অনুপাত আরেকটি কারণ মেয়েদের অবস্থা খারাপ হওয়ার পেছনে।
কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন এতে নির্যাতন বাড়ে, যেমন পাচারকারীদের হাতে মাদকাসক্ত হওয়া বা মার খাওয়া বা মাঝে মাঝে নিহত হওয়া মেয়েরা।
শিশু অধিকার সংস্থা বাচপান বাচাও আন্দোলন (বিবিএ) এর ২০১১ এর ডিসেম্বরে বের করা ‘ভারতের নিখোঁজ বাচ্চারা’ নামের একটি প্রতিবেদনে একটি ভয়ংকর পরিসংখ্যান রয়েছে।
দেশজুড়ে ৩৯২ টি জেলা থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যাচ্ছে ২০০৮ থেকে ২০১০ এর জানুয়ারির এই সময়ে প্রায় এক লাখ বিশ হাজার শিশু নিখোঁজ হয়েছে। এবং ওই সময়ে দিল্লীতে প্রায় ১৪০০০ শিশু হারিয়ে গেছে।
শিশু অধিকার কর্মী শেওতাজ সিং বলেন শিশুদের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি আরও ব্যাপক।
“এই সংখ্যাটা কম কারণ আরও শিশু নিখোঁজ রয়েছে। তারা বেশ কিছু উপায়ে বেশ কিছু দেশে পাচার হয়ে যায় এবং বর্তমান বিশ্বে এটা সবচেয়ে বিকাশমান ক্ষেত্র। চক্রটি বেড়েই চলেছে এবং পুলিশও এটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।”
প্রমোদ কুমার চৌহান সেন্টার ফর অ্যাডভোকেসি রিসার্চের প্রকল্প ব্যবস্থাপক।
“দিল্লীর মানুষ মেয়েদের সম্মান করেনা। এবং এর ফল অনেক কিছু হতে পারে। সামাজিক মনোভাব হচ্ছে নারী শিশুদের অপছন্দ করা এবং সেটাই বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে। তার সাথে যুক্ত হয়েছে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা। এবং এ কারণে মানুষ মেয়ে শিশু চায়না।”
কিন্তু এতো এতো নিখোঁজের ঘটনার পরেও যেসব বাচ্চা হারিয়ে যাচ্ছে তাদের নিবন্ধন করা, খোঁজ রাখা ও পর্যালোচনার জন্যে কোন সমন্বিত ব্যবস্থা নেই।
যুবশক্তি নিয়ে দম্ভ সত্ত্বেও ভারত শিশুদের যত্নে কমই মনোযোগী, বিশেষ করে মেয়েদের।










