
দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানেই প্রথম কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের যৌন হয়রানি থেকে বাঁচাতে একটি যুগান্তকারী বিল পাশ হয়েছে।
তারপরও মহিলাদের নিয়মিত রাস্তায় ও জন পরিবহনে হয়রানি করা হয়।
কিন্তু এখন একটি নতুন গোলাপি বাস পরিষেবা ঝামেলামুক্ত ভ্রমণ নিয়ে এসেছে।
লাহোরে শুরু হওয়া এই বাস পরিষেবাটি দেশের প্রথম মহিলাদের জন্যে আলাদা বাস পরিষেবা।
নাঈম সাহউতারা এটায় উঠে অন্যরকম বোধ করেছেন।
পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে একটি বাসস্টপে মহিলাদের তুলতে একটি বাস আসে।
এটি গোলাপি রঙের এবং মহিলাদের জন্যে নিরাপদ ও ঝামেলামুক্ত ভ্রমণ নিশ্চিত করে।
সাথে পরিবারের মহিলা সদস্য না থাকলে পুরুষদের এটায় ওঠা নিষেধ। অন্যথায় তাদের গ্রেফতার করা হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী মাদিহা শাহ যাত্রীদের একজন।
“এটা খুব ভালো উদ্যোগ। মহিলাদের যে পুরুষদের থেকে আলাদা ভ্রমণ করা উচিৎ এই চিন্তাটা দারুণ। আমাদের জন্যে এটা অনেক আরামের। আপনি তো জানেনই পুরুষ মহিলা এক বাসে চললে কি হয়।”
জন পরিবহনে পুরুষদের জন্যে বিশাল জায়গা থাকলেও ভিড়ের সময় পুরুষেরা প্রায়ই মেয়েদের জায়গায় ঢুকে পড়ে।
মেয়েদের জন্যে খালি আসন খুবই অপ্রতুল এবং হয়রানিও নিয়মিত ঘটে।
গোলাপি বাসটায় এখন ৪০ জন যাত্রী আছেন এবং এরপরও কিছু আসন খালি আছে।
কিছু মহিলা কথা বলছেন আর অন্যেরা বই পড়ছেন বা গান শুনছেন।
পাকিস্তানের কোন সাধারণ বাসে মহিলারা উঠলে এটা চিন্তাও করা যায়না।
হিনা ফাতিমা কানিজ বলেন তিনি সাধারণ বাস ঘৃণা করেন।
“পাবলিক বাস সবসময় লোকে ঠাসা থাকে যারা একে অন্যের পা মাড়িয়ে দেয়। আপনার ভিড়ের মধ্যে সবসময় আপনার ব্যাগের দিকে দৃষ্টি রাখতে হবে এবং পুরুষ কন্ডাক্টররা টিকিট দিতে মেয়েদের জায়গায় ঢুকে পড়ে। পুরুষদের জায়গাটা অনেক বড় আর আমাদের জায়গাটা ছোট। হাতল ধরে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকাটা কষ্টের।”
নতুন গোলাপি বাসে শুধু চালক হচ্ছে পুরুষ। এমনকি কন্ডাক্টরও হচ্ছেন একজন মহিলা।
দরজায় দাঁড়িয়ে ইয়াসমিন আহমেদ যেসব গন্তব্যের টিকিট বিক্রি করেন সেগুলোর নাম ধরে চিৎকার করছেন।
তার পরনে গোলাপি ঐতিহ্যবাহী পোশাক।
“এটা দারুণ ব্যাপার। মানুষ আমাকে সম্মান করে এবং তারা আমার সাথে বেশি স্বস্তি পায়। এখানে মহিলারা পাইলট থেকে শুরু করে অন্য বিভিন্ন পেশায় কাজ করছেন, তবে আমারটা বাদে। এটা প্রমাণ করে মহিলারা সৎ এবং পুরুষদের মতোই পরিশ্রমী (হাসি)।”
“আমার ধারণা গোলাপি রং সব মেয়েই পছন্দ করে। কাজেই মহিলাদের বাসের রং গোলাপিই হওয়া উচিৎ।”
হুমা দাহা এই প্রকল্পের পরিকল্পক। তিনি বেসরকারি লাহোর ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির ব্যবস্থাপক।
“আসলে রাস্তায় ব্যাপারগুলো কিভাবে হয় মানে যারা চালায় তারা কিসব সমস্যার মুখোমুখি হন বা তার উল্টোটা মানে যাত্রীরা কিসের ভেতর দিয়ে যান এটা বোঝার জন্যে আমরা কিছু জরিপ করেছিলাম। তো সেই কাজের সময় আমরা দেখলাম মহিলাদের জন পরিবহনে ভ্রমণ নিয়ে অনেক সমস্যা রয়েছে। অবশ্যই পুরুষদের তুলনায় তাদের জন্যে কম জায়গা বরাদ্দ করা হয়। কাজেই গোলাপি বাস পরিষেবার পিছনে উদ্দেশ্য ছিল ভ্রমণের জন্যে বাসে তাদের আরও জায়গা ও সুবিধা দেওয়া। পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী জানুয়ারি মাসে এটা নিয়ে উদ্যোগী হন এবং আমরা তিনটি গন্তব্যে প্রাথমিকভাবে গোলাপি বাস পরিষেবা চালু করি।”
লাহোর পাকিস্তানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর এবং এর এক লাখ বিশ হাজার লোকের অর্ধেক হচ্ছেন মহিলা।
সাংসদ হামজা শাহবাজ শরীফ গোলাপি বাস পরিষেবার সূচনা করেন।
“পুরুষদের সাথে ভিড়ের বাসে যেতে মহিলাদের হেনস্তা হতে হয়। কাজেই পাঞ্জাবে সরকার পরীক্ষামূলকভাবে এই বাস পরিষেবা চালু করেছে এবং এর সাথে আরও ৫০০ বাস যোগ হবে।”
প্রকল্পে মহিলাদের চালক হিসাবে প্রশিক্ষণেরও পরিকল্পনা রয়েছে।
এখন মহিলাদের কাজ ও পড়ালেখার সুবিধার জন্যে তিনটি বাস ১২ ঘণ্টা চালু থাকে।
বাস কোম্পানির হুমা দাহা বলেন যাত্রীদের সংখ্যার উপর প্রকল্পের সম্প্রসারণ নির্ভর করছে।
“এটা একটা পরীক্ষামূলক প্রকল্প। বর্তমানে আমরা গোলাপি বাস পরিষেবার সমস্যা ও অসুবিধাগুলি নিয়ে কাজ করছি এবং প্রয়োজনীয় ব্যাপারগুলি অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করছি। বাকিটা যাত্রীদের চাহিদার উপর নির্ভর করছে। যতো বেশি মানুষ ভ্রমণ করবে ততো বেশি বাস সংযুক্ত করা হবে। মানুষ যদি কম ভাড়া সত্ত্বেও ভ্রমণ না করে তবে এরকমই থাকবে, তিনটি বাস!”
বেশিরভাগ মহিলা এই বিশেষ যাত্রী পরিষেবাকে স্বাগত জানালেও নারী অধিকারকর্মী মুমতাজ মুঘল ভাবছেন একটু অন্যভাবে।
“এটা লিঙ্গবৈষম্য। বাসের মধ্যে মহিলাদের জন্যে আলাদা জায়গা রাখার মধ্যে দিয়ে এটার সূচনা হয়েছিলো। কারণ আমাদের রক্ষণশীল সমাজে নিজেদের ধার্মিক মনে করা হয় এবং তারা ভাবে বাসের ভেতর নারী ও পুরুষের একসাথে থাকা খারাপ ব্যাপার। এবং এই রক্ষণশীল মনোভাব পরিবর্তনের বদলে সরকার কেন মহিলাদের জন্যে আলাদা বাসের মাধ্যমে তাদের আরও আলাদা করে ফেলছে? বড় ব্যাপার হচ্ছে মনোভাব অবশ্যই বদলাতে হবে।”
কিন্তু এখনকার মতো বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ফৌজিয়া জামিল বলেন এখন প্রতিদিন শান্তিতে কাজ করতে যেতে পারায় তিনি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন।
“এই বাসটা অনেক ভালো কারণ এমনি বাসে ছেলেরা আমাদের বিরক্ত করে। তারা আমাদের আগেই উঠে পড়ে এবং ভেতরে আমাদের টিটকারি করা হয়। এখন আমরা বাসের ভেতর বন্ধুদের সাথে গল্প করতে করতে নিরাপদে ও আরামে ভ্রমণ করতে পারি। সাধারণ বাস যাত্রী ধরতে খুব দ্রুত ছোটে। কিন্তু এটা আমাদের জন্যে অনেক নিরাপদ।”










